গাজীপুর মহানগরের গাছা থানাধীন কামারঝুরি ও দৌলতপুর এলাকায় জমি দখল, গাছপালা কেটে ক্ষতিসাধন এবং পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগের ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর অভিযোগকারী পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও গালিগালাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সুষ্ঠু সমাধান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর ছেলে আমির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, তাঁদের পরিবারের জমি দখল, গাছপালা কেটে ক্ষতিসাধন ও হুমকি দেওয়ার ঘটনায় গাছা থানায় লিখিত অভিযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত তাঁরা কোনো প্রতিকার পাননি। বরং ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করা ব্যক্তিদের কয়েকজন প্রকাশ্যে তাঁদের গালিগালাজ করছেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আমির হোসেন আরও বলেন, তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করা হোক। নথিপত্র যাচাইয়ে তাঁরা বৈধ মালিক প্রমাণিত হলে তাঁদের জমি বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ও স্থানীয় সামাজিক ব্যক্তিবর্গের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে, জমি দখল, গাছপালা কেটে ক্ষতিসাধন এবং পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মোহাম্মদ ইউসুফ আলী গাছা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, কামারঝুরি ও দৌলতপুর মৌজায় তাঁর, তাঁর স্ত্রী খোদেজা বেগম এবং ছেলে আমির হোসেনের মালিকানাধীন জমি রয়েছে। এর মধ্যে দৌলতপুর মৌজার প্রায় পাঁচ শতাংশ জমি অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন বলে দাবি করেন তিনি। ওই জমির একটি অংশ ২০২৪ সালে শরিফুল নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও করেন ইউসুফ আলী।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, জমিতে থাকা ফলজ ও বনজ গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে এবং সেখানে একটি সেড নির্মাণ করে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত ১৮ মে ২০২৬ সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে ইউসুফ আলী বাড়িতে না থাকার সুযোগে অভিযুক্তরা কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে জমিতে প্রবেশ করেন। এ সময় গাছপালা কেটে আনুমানিক পাঁচ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ইউসুফ আলীর দাবি, তাঁর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা বাধা দিতে গেলে তাঁদের হত্যার এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করার হুমকি দেওয়া হয়। পাশাপাশি জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নেওয়া ও সেখানে দেয়াল নির্মাণ করে ভবিষ্যতে জমি ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির আশঙ্কার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আবদুল আল মামুন মন্ডলের অনুসারী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাঁদের দাবি, মামুন মন্ডলের প্রভাব কাজে লাগিয়ে অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে জমিগুলো ভোগদখল করে আসছেন। জমির মালিকানা নিয়ে একাধিকবার সামাজিকভাবে বিচার-সালিশ হলেও তাঁরা জমি বুঝে পাননি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে গাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অভিযোগটি থানায় দায়ের করা হয়েছে এবং এর বিষয়বস্তু তদন্ত করা হচ্ছে। উভয় পক্ষকে ডেকে ঘটনার সত্যতা জানার চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া অভিযোগটি তদন্তের দায়িত্ব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরকে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার থানায় ডাকা হলেও তাঁদের কেউই থানায় উপস্থিত হননি বলে জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে আবদুর রউফ, সোহেল, শাওন ও ফজলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের কয়েকজন এলাকায় না থাকায় এবং মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, আবদুল আল মামুন মন্ডল গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। এ কারণে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর গ্রেপ্তার, মামলা-সংক্রান্ত তথ্য এবং অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় জমির মালিকানা-সংক্রান্ত দলিল, খতিয়ান ও অন্যান্য ভূমি-নথি যাচাই করে বিরোধের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নতুন করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।