

পাবনার সাঁথিয়ায় মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আলোচনায় আসা গ্রামপুলিশ সাগর হোসেন অবশেষে মাকে কাছে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখার কথা বলার পর অনুশোচনায় তিন দিন ঘুমাতে পারেননি বলে জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) মাকে সঙ্গে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হাজির হয়ে সারা জীবন তার দেখাশোনা করার প্রতিশ্রুতি দেন সাগর।
সাগর হোসেন সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রাম পুলিশ। গত ৮ অক্টোবর ইউএনওর কার্যালয়ে শুনানির সময় মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও সেদিন রাজি করানো যায়নি। তবে গতকাল রোববার পাবনা আদালতের হস্তক্ষেপে মা-ছেলের বিরোধের সমাধান হয়। এরপর থেকে ছেলে সাগরের সঙ্গেই আছেন মা মুন্নি খাতুন
সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাকে সঙ্গে নিয়ে সাঁথিয়ার ইউএনও সেলিম আহমেদের কার্যালয়ে যান সাগর। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মামা জাকির হোসেন ও খালু মাসুদ রানা। সেখানে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকদের সামনে মাকে সারা জীবন নিজের কাছে রাখার অঙ্গীকার করেন তিনি। এ সময় মা-ছেলে একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান।
সাগর হোসেন বলেন, ‘রাগের মাথায় মাকে আমার সঙ্গে না নেওয়ার কথা বলিছিলাম। কিন্তু এর পর থেকে অনুশোচনায় তিন দিন ঘুমাব্যার পারিনাই। এখন ভুল বুঝব্যার পারিছি। যত দিন বাঁইচ্যা থাকব, মাকে এক দিনের জন্যও আমার কাছের থ্যা দূরে থাকপ্যার দেব না।’
ছেলের সঙ্গে থাকতে পেরে খুশি মুন্নি খাতুনও। ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ‘পাবনার আদালত ছেলেসহ আমাকে গতকাল (রোববার) ডাইক্যা নিয়্যা গেছিল। ছেলে সেখানেই আমার কাছে মাফ চাইছে। ছেলের প্রতি আমার কোনো রাগ-অভিমান নাই। গতকালের থ্যা ছেলের বাসায়ই আছি। ছেলে, ছেলের বউ আমাকে খুব যত্ন করতেছে। আমার ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’
মুন্নি খাতুনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় জীবনের শেষ সময়ে ছেলে সাগরের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সাগরের বিয়ের পর থেকে তার স্ত্রী ও মায়ের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। এ নিয়ে পরিবারে অশান্তি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানান সাগর। বিরোধ মেটাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার চেষ্টা করেও সফল হননি।
পরে মায়ের আশ্রয় ও ভরণপোষণের দাবিতে সাঁথিয়ার ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন মুন্নি খাতুন। ৮ অক্টোবর ইউএনওর কার্যালয়ে শুনানিতে সাগর মাকে মাসিক খরচ দিতে রাজি হলেও নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে মাকে সঙ্গে রাখলে আত্মহত্যা করবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শুনানির ঘটনাটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
ইউএনও সেলিম আহমেদ জানান, ৮ অক্টোবরের শুনানিতে তিনি সাগরকে মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। পরে ১২ অক্টোবর তাকে আবার শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। এর আগেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাটি আদালতের নজরে আসে। গতকাল রোববার আদালত মা ও ছেলেকে ডেকে তাদের বক্তব্য শোনেন এবং বিরোধের সমাধানে উদ্যোগ নেন।
সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আজ সাগর আমার কার্যালয়ে এসে আমার, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকদের সামনে মাকে সারা জীবন তার কাছে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। মা-ছেলে একে অপরকে মিষ্টি খাইয়েছেন। তারা দুজনেই এখন খুব খুশি। এ জন্য আদালতকে ধন্যবাদ জানাই।’
সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিছুর রহমান জানান, আদালতের নির্দেশে মা ও ছেলেকে পুলিশের গাড়িতে করে আদালতে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, আদালত দুজনের বক্তব্য শুনে তাদের বিরোধের সমাধান করে দেন। পরে মা ও ছেলেকে একসঙ্গে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপরও তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আদালত ও ইউএনও স্যারের উদ্যোগে বিষয়টি বুঝব্যার পারিছি। এখন মাকে নিজের কাছে রাখব্যার পাইর্যা খুব ভালো লাগতেছে। সারা জীবন তার দেখাশোনা করব, আর কোনো দিন তাকে দূরে সরায়া দেব না।’
মন্তব্য করুন