
বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের গ্রামীণ জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির এক সময়কার প্রাণ ছিল ঐতিহ্যবাহী বেত শিল্প। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ১৯৮৪ সালে মাদারীপুর জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও জেলার শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর, আলেপুর, দত্তপাড়া, সন্ন্যাসীর চর, উমেদপুর, ভদ্রাসনসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে এই শিল্পের ঐতিহ্য বহুদিন ধরে টিকে ছিল। একসময় এসব গ্রামে বেতের শব্দেই মুখর থাকত ঘরবাড়ি ও কর্মশালা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কারিগরদের হাতে জন্ম নিত চেয়ার, মোড়া, ঝুড়ি, ডালা, খাটসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অসংখ্য পণ্য।
কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই দৃশ্য এখন প্রায় বিলীন। আধুনিকতার ছোঁয়া, প্লাস্টিক ও ফোমের আসবাবপত্রের দাপট, কাঁচামালের সংকট এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে শত বছরের এই কারিগরি ঐতিহ্য।
স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো ভেসে ওঠে সেই সোনালি দিনগুলো। তাদের ভাষায়, একসময় গ্রামের শত শত পরিবার বেতশিল্পকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করত। হাটে-বাজারে বেতের তৈরি পণ্যের ছিল আলাদা কদর ও চাহিদা। কিন্তু আজ সেই পরিচিত দৃশ্য শুধু স্মৃতিই হয়ে আছে।
আলেপুরের অভিজ্ঞ বেতশিল্পী মো. আলমগীর হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “আগে সারাবছর কাজের চাপ সামলাতে পারতাম না। এখন মাসে এক-দুইটা অর্ডারও আসে না। কাঁচামাল কিনতে যে টাকা লাগে, সেই দামও পাই না। তাই বাধ্য হয়ে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক মো. কাজী শহিদ বলেন, একসময় শিবচরের বেত শিল্প ছিল আমাদের সংস্কৃতির গর্ব। কিন্তু এখন তরুণরা বিদেশমুখী। কেউ আর এই পেশায় আসতে চায় না। ফলে একটি ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, নদীভাঙন, কাঁচামালের সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব, আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না পারা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি সব মিলিয়ে এই শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান বলেন, ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। স্থানীয়ভাবে বেত শিল্পের উন্নয়ন ও কারিগরদের সহায়তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, ডিজাইন উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বেত শিল্প আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
মন্তব্য করুন