
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার একটি আলিম মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে চাকরি করলেও নিজে নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে মামাকে দিয়ে পাঠদান করানোর কথা স্বীকার করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক নাফিউল ইসলাম জীবন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালন না করেই ওই পদে নিয়মিত বেতন-ভাতার অংশ নিচ্ছেন তিনি। বিষয়টি জানার পর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
নাফিউল ইসলাম জীবন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। বর্তমানে তিনি বাঘা উপজেলার পারসওতা হযরত শাহ সুফি বাঘু দেওয়ান (রহ.) আলিম মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালে ওই মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন জীবন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, যোগদানের পর থেকে তিনি নিজে নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে তাঁর মামা আসমত আলীকে দিয়ে পাঠদান করিয়ে আসছেন। বিনিময়ে মাদরাসা থেকে পাওয়া বেতনের একটি অংশ মামাকে দেন তিনি। জীবন নিজেও প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ বজলুল করীম জানান, জীবনের পরিবর্তে অন্য একজন শিক্ষক ক্লাস নেন। জীবন তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর মাস্টার্স সম্পন্ন হয়নি। তাই পড়াশোনা শেষ করার সুযোগ দিতে সাময়িকভাবে অন্য একজনকে দিয়ে ক্লাস করানোর ব্যবস্থা করা হয়।
প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করানো নিয়মসম্মত কি না, জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, ‘কমিটির কেউ এতে বাধা দেননি। আমাদের পক্ষ থেকেও কেউ বাধা দিচ্ছেন না। এভাবেই চালিয়ে নিচ্ছি। আমাদের লোকজনও কিছু বলেন না। শুরু থেকেই প্রক্সি ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। মাস্টার্স শেষ করলেই হয়তো তিনি নিয়মিত ক্লাস নেবেন।’
জীবনের পরিবর্তে যিনি ক্লাস নেন, তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে অধ্যক্ষ আসমত আলীর নাম উল্লেখ করেন।
চাকরিতে যোগদান ও প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করানোর বিষয়ে নাফিউল ইসলাম জীবন জানান, অনার্স শেষ করার পর ২০২৩-২৪ সালের দিকে শিক্ষক নিবন্ধনের সুযোগ আসে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নিজের জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজন বিবেচনায় তিনি নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন বলে জানান তিনি।
জীবন বলেন, ‘রাকসু নির্বাচনের পর আমি চাকরিতে যোগ দিই। তখনও আমার মাস্টার্স শেষ হয়নি। বিষয়টি মাদরাসার প্রিন্সিপালকে জানিয়ে তাঁর কাছে অনুরোধ করি, যেন আমাকে মাস্টার্স শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়। তখন স্যারেরা বলেন, ঠিক আছে, তুমি মাস্টার্স করো। তবে ক্লাস তো আর বন্ধ রাখা যায় না, তাই কাউকে দিয়ে ক্লাস করিও।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এলাকায় কামিল পাস করা একজন ছিলেন, যিনি সম্পর্কে আমার মামা হন। তাঁকে বলি, আপনি আমার পরিবর্তে ক্লাসগুলো নেন। এভাবেই চলতে থাকে। বেতন যা পাই, অর্ধেক তাঁকে দিতে হয় আর অর্ধেক আমি নিই।’
বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন কি না, জানতে চাইলে জীবন বলেন, ‘বিষয়টি আমি আড়াল করে রাখার চেষ্টা করেছি, কারণ এর সঙ্গে আমার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টিও জড়িত। আসলে এটাকে পুরোপুরি বৈধ বলা যায় না, কারণ আমার চাকরিটি অন্য একজন চালিয়ে যাচ্ছেন।’
এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তকী ফয়সাল তালুকদার বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। যেহেতু এ রকম প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করানোর কোনো নিয়ম নেই, আমরা এ বিষয়ে খোঁজখবর নেব এবং তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মন্তব্য করুন