
প্রমত্তা পদ্মার খামখেয়ালিপনায় বারবার বদলে যায় চরাঞ্চলের মানচিত্র। কোথাও নদী গিলে খায় বসতভিটা, কোথাও আবার নতুন জমি জেগে ওঠে। এই ভাঙা–গড়ার মধ্যেই টিকে আছে চরের মানুষের জীবন। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সীমিত সুযোগ–সুবিধা আর প্রকৃতির রূঢ় বাস্তবতার মাঝেও তারা বাঁচে হাসিমুখে ভিটার টানেই গড়ে তোলে নতুন জীবন, নতুন আশ্রয়।
চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন এখনো অতি সাধারণ। আধুনিক নাগরিক সুবিধা তাদের কাছে অনেকটাই অজানা। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপ্রতুল, স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত। কোমলমতি শিশুরা প্রতিদিন কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে বিদ্যালয়ে যায় এটাই তাদের জীবনের স্বাভাবিক চিত্র।
চিকিৎসা পাওয়া এখানকার মানুষের কাছে একপ্রকার ভাগ্যের ব্যাপার। চর জানাজাতের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (৪৫) বলেন,
আমরা অসুস্থ হলে প্রথম চিন্তা হয় কীভাবে পাড়ে যাব। সরকারি একটা ক্লিনিক ছিল, তাও ৫–৬ বছর হলো পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ১০ মাইল এলাকা জুড়ে বাড়িঘর এখন শুধু নদীর তলায়। এখন নৌকা না পেলে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। অনেক সময় নদী উত্তাল থাকলে জীবনটাই ঝুঁকিতে পড়ে।
একই অবস্থা বাজার–সদাই বা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেও। নৌকা বা ট্রলারই একমাত্র ভরসা। চর জানাজাত ইউনিয়নের গৃহবধূ রোকসানা বেগম (৩২) বলেন,
সাপ্তাহিক হাট এখন আর হয় না এখানে। নদী পার হয়ে মাদবরের চর হাটে গিয়ে বাজার করতে হয়। ওখানে যেতে প্রায় ২ ঘণ্টা লেগে যায়। বর্ষায় নদী ফুলে উঠলে সময়মতো নৌকা না পেলে হাটে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। শীতের মৌসুমী যানবাহন না থাকায় ঘন্টা পর ঘন্টা হেঁটে যেতে হয়। তারপরও সংসার তো চালাতেই হয়।
চরের জমি উর্বর হলেও ভাঙনের ভয় সবসময় তাড়া করে ফেরে। তবুও এখানকার মানুষ ভিটেমাটি ছাড়তে চায় না। বর্ষা এলেই অনেকে ঘর-বাড়ি খুলে ট্রলারে করে পাশের ইউনিয়নে জমি ভাড়া নিয়ে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নেয়। কিন্তু পদ্মার স্রোত গিলে ফেললেও, নতুন চর জেগে উঠলে তারা আবার ফিরে আসে সেই পুরনো মাটিতেই আশার আলোয় নতুন করে জীবন গড়ার প্রত্যয়ে।
মন্তব্য করুন