
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় গ্রেপ্তার, কারাভোগ ও চাকরিচ্যুত হওয়া কর পরিদর্শক আবু হাসান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এবার নিজ গ্রামের বাসিন্দারা নানা অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, চাকরি হারানোর পর তিনি গ্রাম্য রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়েছেন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়া, ব্যবসায়ীদের হয়রানি, কয়েকজন যুবককে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানোর মতো অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে কালিয়াকৈর উপজেলার কোটামণি গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কোটামণি গ্রামের মৃত চান মিয়ার ছেলে আবু হাসান দুদকের মামলায় কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। পরে তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর তিনি নিজ গ্রামে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৫ সালের শুরুতে তিনি কালিয়াকৈর উপজেলার বড়ইবাড়ী এ.কে.ইউ ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন।
প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র আট মাসে অফিস সংস্কার, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ (এসি) স্থাপন, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তাঁর দাবি, শুধু একটি বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনেই প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের কক্ষ সংস্কার ও এসি স্থাপনে আরও প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের তহবিলে অন্তত ৮০ লাখ টাকা থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে সেই পরিমাণ অর্থ নেই। ফলে প্রায় অর্ধশত শিক্ষক-কর্মচারীর ছয় মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক শিক্ষক বলেন, ‘দুর্নীতির মামলার একজন আসামি কীভাবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হন, সেটাই প্রশ্ন। তিনি দায়িত্বে থাকাকালে প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকেও বিভিন্নভাবে অর্থ লুটপাট করেছেন।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আবু হাসান তাঁর অর্থের প্রভাব ব্যবহার করে কয়েকজন যুবক ও ছাত্রদল পরিচয়ধারী কিছু শিক্ষার্থীকে দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করান। সম্প্রতি বড়ইবাড়ী এলাকার কয়েকজন স-মিল ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বন বিভাগে ভুয়া তথ্য দিয়ে অভিযোগ করে তাঁদের হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে রিমন মিয়া নামে এক শিক্ষার্থীকে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের আরও অভিযোগ, মাদক সেবনের অভিযোগে ওই শিক্ষার্থী পুলিশে আটক হওয়ার পর তাঁকে ছাড়িয়ে আনতেও আবু হাসান অর্থ ব্যয় করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আবু হাসানের ছোট ভাই আশরাফুল আলম ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সময় গ্রামের মানুষের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারও চালিয়ে আসছেন।
গ্রামবাসীর দাবি, আবু হাসান নিজেকে বিএনপির লোক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার চেষ্টা করেন। চাকরি হারানোর পরও তিনি তাঁর ছোট ভাই আশরাফুল আলমকে গাজীপুর ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বানিয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন নিজের অনেক কাজই ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করেন তিনি।
বড়ইবাড়ী গ্রামের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগে আবু হাসানকে এলাকায় খুব বেশি কেউ চিনত না। পরে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে টাকা খরচ করে পরিচিতি বাড়িয়েছেন। এখন তিনি অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের মালিক। গ্রামের মানুষ তাঁকে টাকার কুমির বলে। তাঁর প্রভাবের কারণে অনেকে মুখ খুলতেও ভয় পান।’
আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘যার বাড়িতে একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরাত, তিনি এখন গ্রামের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন। চাকরি না থাকলেও অর্থ উপার্জনের নানা পথ তিনি ধরে রেখেছেন। গ্রামের মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করেন। তাঁর পেছনে গ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তার সমর্থন রয়েছে বলেও শোনা যায়।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে আবু হাসান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলামের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘যা শুনেছেন, সব লিখে দেন।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
দুদকের তথ্যমতে, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২১ সালে আবু হাসান ও তাঁর স্ত্রী লাকী রেজওয়ানার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করা হয়।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে আবু হাসান ২৮ লাখ ২৮ হাজার ২৭৭ টাকার অস্থাবর সম্পদের হিসাব দিলেও অনুসন্ধানে তাঁর নামে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একটি ডুপ্লেক্স বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। ওই বাড়ির দালিলিক মূল্য ১ কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৫ টাকা, যা তিনি সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করেননি। এ ছাড়া তিনি ১ কোটি ৩২ লাখ ১ হাজার ৮৯৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলেও অভিযোগ আনা হয়। একই সঙ্গে ২০১৯ সালে নতুন টিআইএন খুলে আয়কর নথিতে প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ বৈধ করার চেষ্টা চালানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অন্য মামলায় দুদকের অভিযোগ, আবু হাসানের স্ত্রী লাকী রেজওয়ানা ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ৪১ লাখ ১৭ হাজার ৬৭১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি স্বামীর অবৈধ আয়ের উৎস আড়াল করতে সহযোগিতা করেছেন। দুদকের ভাষ্য, স্বামী-স্ত্রী মিলে মোট ২ কোটি ৬৮ লাখ ২৯ হাজার ৮৭৭ টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, লাকী রেজওয়ানা সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ৬৯ লাখ ৯১ হাজার ৮৮৫ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব দিলেও প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ পাওয়া যায় ৩ কোটি ১১ লাখ ৯ হাজার ৫৫৬ টাকা। অর্থাৎ তিনি ১ কোটি ৪১ লাখ ১৭ হাজার ৬৭১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। পাশাপাশি তাঁর নামে ১ কোটি ২৭ লাখ ১২ হাজার ২০৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে দুদকের মামলায় উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় দুদক আইন, ২০০৪ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
মন্তব্য করুন