

মামলার হুলিয়া, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের শঙ্কা—কোনো কিছুই যেন থামাতে পারছে না নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর তৎপরতা। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল ও প্রকাশ্য কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে শিল্পনগরী গাজীপুর, যেখানে একের পর এক ঝটিকা মিছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত কয়েক মাস ধরে গাজীপুর মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা হঠাৎ মিছিল বের করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করছেন। কখনও ২০-৩০ জন, আবার কখনও শতাধিক নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে এসব মিছিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে মিছিলকারীরা অল্প সময়ের মধ্যে স্থান ত্যাগ করছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও এসব কর্মসূচি বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হলেও ঝটিকা মিছিলের সংখ্যা কমেনি বলে দাবি স্থানীয়দের।
ঈদুল আজহার পর থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর তৎপরতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সমন্বয়ের কারণে দ্রুত জড়ো হয়ে কর্মসূচি পালন করতে সক্ষম হচ্ছেন নেতাকর্মীরা।
শুধু গাজীপুর নয়, চট্টগ্রামেও সম্প্রতি একাধিক ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকালে নগরের কুয়াইশ-অক্সিজেন সড়কের অনন্যা আবাসিক এলাকায় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের ব্যানারে একটি মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, মিছিলটি কুয়াইশ এলাকা থেকে শুরু হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে গিয়ে সমাবেশে রূপ নেয়।
এর আগে সোমবার সকালে নগরের সানমার ওশান সিটি শপিং কমপ্লেক্সের সামনে ‘ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ/ছাত্র সংসদ’-এর ব্যানারে শতাধিক নেতাকর্মীর একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী এলাকায়ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, “নিষিদ্ধ সংগঠনকে আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশকে অ্যালার্ট করা হয়েছে। এখন থেকে তারা সবসময় সতর্ক থাকবে।”
অন্যদিকে, হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুর রহমান বলেন, “মিছিলের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”
এসব ঘটনার পর চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৭০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ ঘোষণার পর থেকে চট্টগ্রাম নগর ও উপজেলাগুলোতে শতাধিক ঝটিকা মিছিল হয়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে গাজীপুরেও, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও অভিযানের মধ্যেও সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরে ২৩ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে নতুন সরকারের আমলে এসব সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রেপ্তার ও আইনগত চাপ সত্ত্বেও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক ঝটিকা মিছিল প্রমাণ করছে যে তাদের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এখনও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েনি। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
মন্তব্য করুন